নৃবিজ্ঞান কি ধরনের বিজ্ঞান?- নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

 নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

 নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

নৃবিজ্ঞান কি ধরনের বিজ্ঞান?

নৃবিজ্ঞান” হল ইংরেজী ‘ধ্যান্রোপলজি’-র বাংলা প্রতিশন্দ। ‘এ্যান্ত্রোপলজি’-র(anthropology)  কথাটির মূলে রয়েছে একটি গ্রীক শব্দ *এ্যান্ত্রোপস* যার অর্থ মানুষ। সংস্কৃত শব্দ ‘নৃ” মানেও তাই।
কাজেই “নৃবিজ্ঞান কথাটির অর্থ দাড়ায় “মানব বিষয়ক বিজ্ঞান”

(উল্লেখ্য, বাংলায় গ্যান্ত্রোপলজির প্রতিশব্দ হিসাবে মানব বিজ্ঞান কথাটি কেউ কেউ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তা বহুল প্রচলিত নয়)। তবে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাশান্ত্রসহ আরো অনেক শান্তর বা জ্ঞানকান্ড রয়েছে, যেগুলোও কোন না কোনভাবে মানব বিষয়ক বিজ্ঞান বটে।

কাজেই শুধুমাত্র “মানব বিষয়ক বিজ্ঞান” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করলে নৃবিজ্ঞানকে আলাদা করে চেনা যায় না। নৃবিজ্ঞানের বিশেষত এই যে, মানব বিষয়ক অন্যান্য বিজ্ঞানের তুলনায় এর বিষয়বস্তু ব্যাপকতর পরিধিসম্পন্ন ও অধিকতর বৈচিত্রপূর্ণ।

নৃবিজ্ঞানে একাধারে মানব সম্ভার জৈবিক ও সাংস্কৃতিক স্বরূপ অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়, এবং তা করতে গিয়ে এর অনুসন্ধিৎসার ক্ষেত্র বিস্তৃত রয়েছে এক বিশাল পটভূমি জুড়ে, যার আওতায় পড়ে সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীত থেকে শুরু করে এ যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যত ধরনের মানবগোষ্ঠী বাস করে গেছে বা করছে,সবাই।

‘নৃবিজ্ঞান”-এর পরিবর্তে ‘নৃতত্ত’ কথাটি আপনাদের কাছে অধিকতর পরিচিত হতে পরে। ‘ধ্যান্রোভসজি’র প্রতিশন্দ হিসেবে শেষোক্ত শব্দটি বাংলা ভাষায় চালু রয়েছে দীর্ঘতর সময় ধরে (ক্ষেত্রবিশেষে ‘নৃবিদ্যাণ
শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে)। আপনি হয়তবা লক্ষ্য করেছেন যে, বাংলা ভাষায় রচিত অনেক বইপুস্তক বা পত্রপত্রিকায় বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষিতে “নৃতাত্তিক বৈশিষ্ট্য” বা ‘নৃতান্তিক ইতিহাস” ইত্যাদি কথা
ব্যবহার করা হয়, যেগুলি দিয়ে সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাহ্যিক দৈহিক বৈশিষ্ট্য বা প্রাগৈতিহাসিক অতীত সংক্রান্ত বিষয়াদি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়।

 নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

এক্ষেত্রে ‘নৃতাত্তিক’ বিশেষণটা এমন সব বিষয়কে নির্দেশ করে যেগুলো নিয়ে নৃবিজ্ঞানের কোন কোন শাখায়–বিশেষ করে দৈহিক নৃবিজ্ঞান ও প্রততাত্তিক নৃবিজ্ঞানে–হয়ত একসময় ব্যাপক গবেষণা বা লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু শুধুমাত্র এসব বিষয় দিয়ে নৃবিজ্ঞানের পুরো পরিচয় পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে ‘নৃতত্ত’ পদটি, বা এর বিশেষণরূপ “নৃতাত্ত্বিক, যেভাবে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, তা সমকালীন প্রেক্ষাপটে যথার্থ নয়।

এ্যান্ত্রোপলজির অপেক্ষাকৃত পুরানো প্রতিশব্দ ‘নৃতত্ত’ বাংলা ভাষায় যে সময় চালু হয়েছিল, তখন ইউরোপ ও আমেরিকাতেও এমন একটা ধারণা ব্যাপকভাবে চালু ছিল যে এটি হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান যেখানে
মূলতঃ মানব জাতির উৎপত্তি ও বিবর্তন, বিভিন্ন ধরনের মানবগোষ্ঠীর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য, এবং “আদিম” সমাজ বা সংস্কৃতি অধ্যয়ন করা হয়। এ ধরনের ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না, কারণ বিংশ
শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত মূলতঃ উল্লিখিত বিষয়গুলোর উপরই ‘নৃতাত্তিক’ গবেষণা ও লেখালেখির ঝৌক বেশী ছিল।

তবে সময়ের সাথে সাথে এই প্রবণতা পাল্টে গেছে, এবং নৃতান্তিক অধ্যয়নের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ওবিষয়বস্তুকে অনেকটাই ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সমকালীন প্রেক্ষাপটে নৃতত্ত মানেই মানুষের
উৎপত্তির ইতিহাস বা আদিম সমাজ অধ্যয়ন, একথা আর বলা যায় না। এখনকার নৃতত্ুবিদদের অনেকেই অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানীদের মতই সমকালীন বিভিন্ন ধরনের সমাজ, তাদের সংস্কৃতি-অর্থনীতি-
রাজনীতি ইত্যাদি নানান বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন।

আর এই পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে “নৃতত্ত’র বদলে ‘নৃবিজ্ঞানই ‘এ্যান্ত্রোপলজি’র প্রতিশব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বিষয় পড়ানো শুরু হওয়ার সময় থেকে। একইভাবে নৃবিজ্ঞান চর্চার সাথে যুক্ত শিক্ষক-গবেষকরা ‘নৃতত্বিদ’-এর বদলে ‘নৃবিজ্ঞানী” হিসাবেই নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন।

 নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

সাধারণভাবে বলা যায়, সমকালীন প্রেক্ষাপটে নৃবিজ্ঞান হচ্ছে বিভিন্ন উপবিভাগ সম্বলিত এমন একটি জ্ঞানকান্ড যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে “মানুষ’কে অধ্যয়ন করে। আগেই বলা হয়েছে, নৃবিজ্ঞানে একাধারে
মানব সম্ভার জৈবিক ও সাংস্কৃতিক স্বরূপ অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়। একটি প্রজাতি হিসেবে মানুষের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস থেকে শুরু করে অতীত ও বর্তমানকালের বিভিন্ন ধরনের মানব সমাজের
সংস্কৃতি-অর্থনীতি-রাজনৈতিক সংগঠন প্রভৃতির সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক অধ্যয়ন নৃবিজ্ঞানে করা হয়।

বিষয়-বৈচিত্রের দিক থেকে বিশাল পরিধির অধিকারী এই জ্ঞানকান্ডের স্বভাবতই রয়েছে বিভিন্ন উপবিভাগ ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র। তবে দেশ-কাল ভেদে এই উপবিভাগগুলোর নামকরণ ও শ্রেণীকরণে
তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।

মার্কিন ধারার নৃবিজ্ঞানে সচরাচর চারটি প্রধান উপবিভাগ চিহ্নিত করা হয়, এগুলি হল, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান, প্রত্রতান্তিক নৃবিজ্ঞান, ভাষাতাত্তিক নৃবিজ্ঞান ও দৈহিক নৃবিজ্ঞান। অনেকে অবশ্য প্রতিতান্তিক ও
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানকে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানেরই দুটি শাখা হিসাবে গণ্য করেন  বা জাতিতত্ত নামে এর আরেকটি শাখা চিহ্নিত করেন। ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় ধারার নৃবিজ্ঞানে “সংস্কৃতি”
ধারণার চাইতে “সমাজ” ধারণার উপর বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে এই প্রেক্ষিতে “সামাজিক নৃবিজ্ঞান” কথাটি অধিকতর প্রচলিত।

 নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
নৃবিজ্ঞানের সংজ্ঞা

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত নৃবিজ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্রপুলোর মধ্যে বরাবরই বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ ছিল, কাজেই স্থান-কাল ভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত নৃবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারা-উপধারার মধ্যে সবক্ষেত্রে কোন সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা যায় না। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বের অনেক স্থানেই মার্কিন ধারার সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান ও ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞানকে মূলতঃ একই বৃহত্তর ধারার অন্তর্গত হিসাবে গণ্য করা হয়, যাকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান হিসাবে অনেকে অভিহিত করে থাকেন।

সামাজিক-সাংক্কৃতিক নৃবিজ্ঞান তথা নৃবিজ্ঞানের অন্যান্য উপবিভাগের সাথে অন্যান্য জ্ঞানকান্ডের মিথস্তিয়ায় গড়ে উঠেছে বিষয়-ভিত্তিক গবেষণার অনেক বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেমন, অর্থনৈতিক নৃবিজ্ঞান, রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞান, ধর্মের নৃবিজ্ঞান, প্রতিবেশগত নৃবিজ্ঞান, চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান, ফলিত নৃবিজ্ঞান ইত্যাদি।

আরও দেখুনঃ

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!