বাঙলার অলিখিত সাহিত্য | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর

বাঙলার অলিখিত সাহিত্য : বাঙলার অলিখিত বা মৌখিক সাহিত্যের অন্যতম হচ্ছে ‘ধনার বচন। বাঙলার ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি সকলেই এখনও ‘খনার বচন’ আবৃত্তি করে। যেমন তারা বৃষ্টিপাত সম্বন্ধে বলে— ‘শনির সাত মঙ্গলের তিন। আর সব দিনের দিন। আবার যাত্রা প্রসঙ্গে বলে—’মঙ্গলের ঊষা বুধে পা। যথা ইচ্ছা তথ্য যা। আবার মাঘ মাসের শেষে বৃষ্টি পড়লে বলে- ‘ধন্য রাজার পুণ্য দেশ। যদি বর্ষে মাঘের শেষ। এগুলি সবই খনার বচন। ভাষা দেখলে মনে হবে এগুলি সবই আজকের। কিন্তু আসলে তা নয়।

যুগে যুগে লোকমুখে আগে কার ভাষা রূপান্তরিত হয়েছে পরবর্তী কালের চলিত ভাষায়। কেননা খনার বচনের মধ্যে এমন অনেক বচন আছে, যা প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত এবং আজকের লোকের কাছে দুর্বোধ্য। বস্তুতঃ খনা ছিলেন আমাদের দেশের এক জন প্রাচীন বিদুষী জ্যোতিষী। খনার বচনের মাধ্যমেই আমরা তার পরিচয় পাই। যথা, একটা বচনে তিনি বলেছেন—

কিসের তিথি কিসের বার।

জন্ম মৃত্যু কর সার।

কি কর শ্বশুর মতিহীন।

পলকে জীবন কর দিন।

নরা গজা বিশে শয়।

তার অর্ধেক বাঁচে নর।

বাইশ বলদা তের ছাগল।

তার অর্ধেক বরা পাগলা“।

আর একটা বচনে তিনি বলেছেন—

ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী শুনহে পতির পিতা।

ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা“।

এই সকল বচন থেকে আমরা জানতে পারি যে থনার শ্বশুর ছিলেন বরাহ ও স্বামী ছিলেন মিহির। ইতিহাস পাঠে আমরা জানতে পারি যে বরাহ গুপ্তবংশীয় বিক্রমাদিত্য নামধেয় নৃপতি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভা অলংকৃত করতেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল ছিল খ্রীস্টীয় ৩৭৬ থেকে ৪১৫ অব্দ পর্যন্ত। তা থেকে আমরা অনুমান করে নিতে পারি যে খন। খ্রীস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর এক বিদুষী বাঙালী মহিলা জ্যোতিষী ছিলেন। বস্তুতঃ খনাই সবচেয়ে প্রাচীন বাঙালী বিদুষী যার সম্বন্ধে আমাদের কিছু জানা আছে।

দুই

আগেই বলেছি যে মুসলমান শাসনের প্রতিঘাতে মধ্যযুগে বহু মেয়েগী দেবতার আবির্ভাব ঘটেছিল। এসব অধিকাংশ দেবতাকেই মেয়েরা ‘ব্রত’-এর মাধ্যমে আরাধনা করত। এই সকল ব্রত সম্পাদন সম্পূর্ণ হয় না, যতক্ষণ না ওই ব্রত বা পূজা-সম্পর্কিত কোন ছড়া বা কাহিনী বলা হয়। ছড়া বা কাহিনীগুলো সবই অলিখিত। যদিও আজকাল ছাপাখানার দৌলতে এগুলোর কিছু কিছু ছাপা হয়েছে, তা হলেও মূলগতভাবে এগুলো অলিখিত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই অলিখিত সাহিত্য পুরুষ-পরম্পরায় চলে এসেছে। আজও চলছে। শেষ কাহিনী সস্তোষীমায়ের, যার ব্রত শুরু হয়েছে মাত্র এই সত্তরের দশকে।

[ বাঙলার অলিখিত সাহিত্য | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর ]

যত দেবতা তত কাহিনী। সব দেবতার কাহিনী এখানে বিবৃত করা সম্ভবপর নয়। মাত্র প্রধান প্রধান কয়েকটা দেবতার ‘কথা’ই এখানে বিবৃত করছি।

আরও পড়ুন:

প্রথমেই ধরুন লক্ষ্মীর ‘কথা’। একদিন নারায়ণের ইচ্ছা হল পৃথিবীর লোকেরা কিভাবে আছে, তা নিজের চোখে দেখতে যাবেন। লক্ষ্মীঠাকরুণ তাঁকে ধরে বসলেন যে তিনিও সঙ্গে যাবেন। তাকে সঙ্গে নিতে নারায়ণ এক শর্তে রাজী হলেন। শর্তটা হচ্ছে এই যে, ধরাধামে অবতরণের পর লক্ষ্মীঠাকরুণ উত্তর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না।

কিন্তু পৃথিবীতে আসবার পর লক্ষ্মীঠাকরুণের কৌতূহল হল, নারায়ণ তাঁকে উত্তরদিকে তাকাতে মানা করলেন কেন, ওদিকে কি আছে তা তিনি দেখবেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উত্তরদিকে তাকালেন, এবং তাঁর চোখে পড়ল এক তিল-ক্ষেত। তিলের ফুল তাঁর মনকে হরণ করল, এবং তিনি বুথ থেকে নেমে গিয়ে কয়েকটা ফুল তুলে আনলেন। নারায়ণ যখন ফিরে এসে লক্ষ্মীর এই কাণ্ড দেখলেন, তখন তিনি লক্ষ্মীকে বললেন—

এজন্যই আমি তোমাকে উত্তরদিকে তাকাতে মানা করেছিলাম; তুমি কি জান না যে, ক্ষেত্র স্বামীর বিনা অম্লমতিতে তাঁর ক্ষেত্র থেকে ফুল তোলা পাপ ? এখন তোমাকে এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, তিন বছর ওর গৃহে থেকে দাসীবৃত্তি করে।

তারপর নারায়ণ ও লক্ষ্মী ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর বেশ ধারণ করে, ক্ষেত্রপতির গৃহে এসে বললেন—

দেখ, এই স্ত্রীলোক তোমার বিনা অনুমতিতে তোমার ক্ষেত থেকে তিল ফুল তুলেছে, এজন্য ওকে তিন বছর তোমার গৃহে দাসীবৃত্তি করতে হবে, তবে ওকে কখনও উচ্ছিষ্ট খাদ্য দেবে না, ঘর ঝাঁট দিতে দেবে না এবং অপরের পরা ময়লা কাপড় কাচতে দেবে না।

এই কথা বলে নারায়ণ চলে গেলেন। ক্ষেত্রস্বামী নিজেও ব্রাহ্মণ ছিলেন, তবে অত্যন্ত দরিদ্র। স্ত্রী ছাড়া, তাঁর তিন ছেলে, এক মেয়ে ও এক পুত্রবধূ ছিল। তাঁদের নিজেদেরই খাওয়া জোটে না, তারপর আর একজনকে খাওয়াতে হবে এই ভেবে ব্রাহ্মণগৃহিণী খুব চিন্তিত হলেন। তিনি লক্ষ্মীকে বললেন—

‘মা, আমরা খুবই গরীব, আমাদের ঘরে চাল, ডাল কিছুই নেই, তিন ছেলে ভিক্ষায় বেরিয়েছে, যদি কিছু জোগাড় করে আনতে পারে, তবেই আজ আমাদের খাওয়া হবে।’

লক্ষ্মী দেখলেন ব্রাহ্মণগৃহিণী শতচ্ছিন্ন এক মলিন কাপড় পরে আছেন। তাই দেখে লক্ষ্মীঠাকরুণের দয়া হল। তিনি ব্রাহ্মণীকে বললেন-

‘চল তো মা, গিয়ে দেখি কেমন তোমার ঘরে কিছু নেই।’

যখন ব্রাহ্মণগৃহিণী লক্ষ্মীঠাকরুণকে ঘরের ভিতর নিয়ে এলেন, তখন তিনি দেখে আশ্চর্য হলেন যে ঘর ভরতি রয়েছে চাল-ডাল, হন, তেল, ঘি ইত্যাদি, এবং আলনায় ঝুলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়। এই দেখে বাড়ির সকলেই খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠল এবং ভাবল এই স্ত্রীলোক নিশ্চয়ই কোন দেবী হবে। লক্ষ্মীকে কিছু না বলে, তারা মনে মনে তাঁকে প্রণাম করল। সেদিন থেকেই ব্রাহ্মণ পরিবারের ঐশ্বর্য বাড়তে লাগল, এবং তারা লক্ষ্মীর প্রতি বিশেষ যত্নবান হল।

তিন বছরের শেষে একদিন গঙ্গায় পুণ্যস্নানের দিন এল। ব্রাহ্মণ পরিবার গঙ্গাস্নানে যাবেন। তাঁরা লক্ষ্মীকে তাঁদের সঙ্গে যেতে বললেন। লক্ষ্মী বললেন

‘আমি যাব না, তবে আমি এই কড়ি পাঁচটা দিচ্ছি, তোমরা আমার নাম করে এই কড়ি পাঁচটা গঙ্গার জলে ফেলে দেবে’।

গঙ্গাস্নান দারবার পর ব্রাহ্মণগৃহিণীর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, লক্ষ্মী তাঁকে পাঁচটা কড়ি দিয়েছিলেন গঙ্গার জলে ফেলে দেবার জন্য। তিনি কড়ি পাঁচটা আঁচল থেকে খুলে যেমনি গঙ্গায় ফেলে দিলেন, দেখলেন যে, মা গঙ্গা নিজে মকরে চেপে এসে কড়ি পাঁচটা নিয়ে গেলেন। এই দেখে তিনি খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

বাড়িতে ফিরে এসে দেখলেন যে, দুয়ারে একখানা রথ দাড়িয়ে আছে। রথের ভিতর একজন ব্রাহ্মণ রয়েছেন, আর লক্ষ্মী এক পা রথে ও এক পা মাটিতে রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই দেখে ব্রাহ্মণী লক্ষ্মীর পা জড়িয়ে ধরে বললেন –

‘মা, তোমাকে আমরা চিনতে পারিনি, আমাদের যা কিছু দোষত্রুটি হয়েছে আমাদের মাপ কর, আমাদের ছেড়ে তুমি যেও না।’

লক্ষ্মী বললেন,

‘মা, আমার তো আর থাকবার উপায় নেই, তোমাদের বাড়ির দাসী হিসাবে থাকবার আমার তিন বছরের মেয়াদ ছিল, আজ তিন বছর উত্তীর্ণ হয়েছে, নারায়ণ এসেছেন আমাকে গোলোকে নিয়ে যাবার জন্য।’

তিনি আরও বললেন –

‘তোমরা মনে ব্যথা পেও না, বাড়ির পিছনে বেলগাছের তলায় গিয়ে খনন কর, তোমাদের দুঃখ-কষ্ট ঘুচে যাবে ; আর ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ ও চৈত্র মাসে লক্ষ্মীর পূজা করবে; এর ফলে তোমরা সুখী ও ঐশ্বর্যশালী হবে।’

বেলগাছের তলা খুঁড়ে তারা যে ধনরত্ন পেল, তা দিয়ে তারা বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করল ও দাসদাসী পরিবৃত হয়ে ছেলেমেয়ে, জামাই ও পুত্রবধূ নিয়ে সুখে দিন কাটালো। এভাবে ধরাধামে লক্ষ্মীপূজার প্রবর্তন হল।

এবার জয়মঙ্গলচণ্ডীর পূজা প্রবর্তনের কাহিনীটি বলি।

কোন এক দেশে দুই বণিক ছিল। একজনের সাতটি মেয়ে; আর অপরজনের সাতটি ছেলে। এক বাবু মঙ্গলচণ্ডী ভিখারিণী ব্রাহ্মণীর বেশে প্রথম বণিকের বাড়ি ভিক্ষার জন্য আসেন। বণিক-বনিতা ভিক্ষা দিতে এলে, মঙ্গলচণ্ডী বললেন –

‘মা, তুমি অপুত্রক, তোমার হাতে ভিক্ষা নেব না। ভিখারিণী ভিক্ষা না নিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে বণিকপত্নী তার দুটো পা জড়িয়ে ধরে। মঙ্গলচণ্ডী তাকে একটা শুকনো ফুল দিয়ে বললেন, এই ফুল জলে গুলে প্রত্যহ তুমি খাবে, তা হলে তোমার ছেলে হবে এবং ছেলের নাম রাখবে জয়দেব’।

তারপর মঙ্গলচণ্ডী দ্বিতীয় বণিকের বাড়ি গেলেন এবং বণিকপত্নীর মেয়ে সন্তান নেই বলে তার হাত থেকে ভিক্ষা নিলেন না। বণিকপত্নী তাঁর পা জড়িয়ে ধরলে, তাকেও মঙ্গলচণ্ডী একটা শুকনো ফুল দিলেন এবং বললেন,

‘মেয়ে হলে তার নাম রাখবে জয়াবতী।”

এর ফলে দুই বণিকপত্নীরই যথাক্রমে ছেলে ও মেয়ে হল।

জয়দেব একটা পায়রা নিয়ে খেলা করত, আর জয়াবতী ফুল তুলে মঙ্গল চণ্ডীর পূজা করত। একদিন জয়দেবের পায়রাটা উড়ে গিয়ে জয়াবতীর কোলে বসল। জয়দেব পিছনে পিছনে এসে জয়াবতীর কাছ থেকে পায়রাটা ফেরত চাইল। জয়াবতী দিতে অস্বীকার করল। জয়দেব বলল,

‘আমি তোমার পূজার সমস্ত সামগ্রী ভেঙে দেব।’

জয়াবতী বলল,

‘আজ আমি মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করছি, আর তুমি আমার পূজার উপকরণ নষ্ট করতে চাও?’

জয়দেব জিজ্ঞাসা করল—

‘মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করলে কি হয়?’

জয়াবতী বলল —

‘মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত করলে আগুনে কিছু পোড়ে না, জলে কিছু ডোবে না, নষ্ট জিনিস উদ্ধার হয়, কেউ তাকে তরোয়াল দিয়ে কাটতে পারে না, মরে গেলে সে আবার জীবন ফিরে পায়’।

কিছুকাল পরে স্বপ্নে মঙ্গলচণ্ডীর আদেশে জয়দেবের সঙ্গে জয়াবতীর বিয়ে হল। জয়দেব যখন জয়ারতীকে বিয়ে করে নৌকা করে ফিরছিল, জয়াবতীর হঠাৎ মনে পড়ল যে সেটা জয়মঙ্গলবার। জয়াবতী তাড়াতাড়ি মঙ্গলচণ্ডীর একটা শুকনো ফুল গিলে ফেলল এবং দেবীর কাছে প্রার্থনা করল তার ত্রুটি যেন তিনি মার্জনা করেন। জয়দেবের পুরানো দিনের কথা মনে পড়ল, মঙ্গলচণ্ডীর মাহাত্ম্য সম্বন্ধে জন্মাবতী তাকে যা বলেছিল। পরীক্ষা করবার জন্য জয়দেব জয়াবতীকে বলল,

‘এখানে বড় দস্যুর ভয়, তুমি তোমার অলঙ্কারগুলো খুলে ফেলে, একটা পোটলা করে আমাকে দাও।’

জয়াবতী এরূপ করলে, জয়দেব পোঁটলাটা জলে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বোয়াল মাছ এসে সেটা গিলে ফেলল।

বরকনে বাড়ি এলে, অত বড় ধনীর মেয়েকে নিরাভরণা দেখে সকলেই নানারকম মন্তব্য করতে লাগল। জয়াবতী চুপ করে রইল। বউভাতের দিন একটা বড় বোয়াল মাছ আনা হল। জেলে মাছটা কাটতে পারল না। পরীক্ষা করবার জন্য জয়দেব জয়াবতীকে মাছটা কাটতে বলল।

আরও পড়ুন:

 

জয়াবতী রাজী হল, তবে বলল, যে সে পরদার আড়ালে বসে মাছটা কাটবে। পরদার আড়ালে গিয়ে জয়াবতী মঙ্গলচণ্ডীকে স্মরণ করল। মঙ্গলচণ্ডী আবির্ভূতা হয়ে মাছটা কেটে ফেললেন, এবং মাছটার পেট থেকে তার অলঙ্কারের পোঁটলাটা বের করে তার হাতে দিলেন। জয়াবতী যখন অলঙ্কার পরে পরদার ভিতর থেকে বেরুল, তখন সকলে তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। তারপর অত মাছ কেউ রাঁধিতে পারল না। তাও জয়াবতী মঙ্গলচণ্ডীর সাহায্যে বাধল।

তারপর জয়াবতীর এক সন্তান হল। জয়দেব আবার পরীক্ষা করবার জন্য ছেলেটাকে কুমোরদের ভাটির মধ্যে রেখে এল। কিন্তু মঙ্গলচণ্ডী এসে জয়াবতীর কোলে তার সন্তানকে দিয়ে গেলেন। তারপর একদিন জয়দেব ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ডুবিয়ে দিল। আবার মঙ্গলচণ্ডী ছেলেটাকে এনে জয়াবতীর কোলে দিয়ে গেলেন এবং বললেন ভবিষ্যতে যেন সে ছেলের সম্বন্ধে সাবধান হয়। একদিন জয়দেব ছেলেটাকে কেটে ফেলতে যাচ্ছে, এমন সময় জয়াবতী দেখতে পেয়ে, জয়দেবকে বলল—

‘তুমি এখনও মঙ্গলচণ্ডীর দয়ায় বিশ্বাস করছ না?”

জয়দেব বলল—

‘হ্যাঁ, এখন আমি বিশ্বাস করি।’

এইভাবে জয়মঙ্গলবারে মঙ্গল চণ্ডীর পূজার প্রবর্তন হল।

অরণাষষ্ঠীর পূজার প্রবর্তন সম্বন্ধে যে কাহিনীটা আছে, তা হচ্ছে—এক ব্রাহ্মণের তিন পুত্র ও তিন পুত্রবধূ ছিল। ছোট বোঁটা খুব পেটুক ছিল, এবং খাদ্যসামগ্রী লুকিয়ে থেয়ে বিড়ালের নামে দোষ দিত। বিড়াল হচ্ছে মা ষষ্ঠীর বাহন। মিছামিছি তার নামে দোষ দেয় বলে সে মা ষষ্ঠীর কাছে গিয়ে ছোট বৌয়ের নামে নালিশ করল।

কালক্রমে ছোটবৌ অস্তঃসত্ত্বা হল, এবং যথাসময়ে এক পুত্রসন্তান প্রসব করল। কিন্তু পরের দিন সকালবেলা কেউ আর ছেলেটাকে তার কাছে দেখতে পেল না। এইভাবে তার সাতটা সন্তান হল, কিন্তু রাত্রিকালে ছেলেটা অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কেউ আর ছেলের সন্ধান পেল না ।

অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাইষষ্ঠী
অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাইষষ্ঠী

মনের দুঃখে ছোটবৌ বনে গিয়ে কাঁদতে লাগল। সেখানে বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশে ষষ্ঠীঠাকরুণ আবির্ভূতা হয়ে ছোটবৌকে জিজ্ঞাসা করলেন—

‘তুমি বনে এসে কাঁদছ কেন মা?”

ছোটবৌ তাঁকে তার সব দুঃখের কথা বলল। তখন ষষ্ঠীঠাকরুণ বোষকণ্ঠে তাকে বললেন—

‘তুই জানিস না, চুরি করে খাস, আর ষড়ীর বাহন বিড়ালের নামে দোষ দিস্?’

তখন ছোটবৌ বুঝতে পারল ওই ব্রাহ্মণী কে, এবং তাঁর দুটো পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। ষটী দেবীর দয়া হল। তিনি বললেন-

‘দ্যাথ, ওখানে একটা মরা বিড়াল পড়ে আছে, এক ভাঁড় দই এনে ওর গায়ে ঢেলে দে, এবং চেঁটে তা ভাঁড়ে তোল”।

ছোটবৌ ষষ্ঠীর আদেশমতো ওইরূপ করলে, ষড়ীঠাকরুণ তাকে তার সাত ছেলে ফিরিয়ে দিলেন ও তাদের কপালে দইয়ের ফোঁটা দিতে বললেন। তিনি আরও বললেন, ‘কখনও চুরি করে কিছু খাস না। আর বিড়ালকে কখনও লাখি মারবি না, এবং বা হাত দিয়ে কখনও ছেলেকে মারবি না, বা ‘মরে যা’ বলে কখনও ছেলেকে গাল দিবি না।’

অরণ্যষষ্ঠীর দিন কিভাবে ষীপুজা করতে হয়, সে সম্বন্ধেও তিনি উপদেশ দিলেন। আরও বললেন—

‘অরণ্যষষ্ঠীর দিন ফলার করবি, কখনও ভাত খাবি না।’

তারপর ষষ্ঠীদেবী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ছোটবৌ সাত ছেলে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল, এবং সব কথা নিজের জায়েদের বলল। সকলেই সেই থেকে অরণ্যষীর পূজা আরম্ভ করল।

পাঁচ

অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবার মেয়েরা ইতুপূজা করে। ইতুপূজার কথা তারা যা বলে তা হচ্ছে—কোন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের দুই মেয়ে ছিল, নাম উমনো ও ঝুমনো। ব্রাহ্মণ একদিন ভিক্ষা করে কিছু চাল এনে ব্রাহ্মণীকে বললেন তাকে পিঠে তৈরি করে দিতে। এক-একটা পিঠে তৈরি হচ্ছে আর ব্রাহ্মণ দাওয়ায় বসে একগাছা দড়িতে একটা করে গেরো দিচ্ছেন। ব্রাহ্মণকে যখন পিঠে দেওয়া হল, তখন তিনি দুখানা পিঠে কম দেখলেন।

গৃহিণী বললেন, দুখানা পিঠে দুই মেয়েকে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হয়ে, দুই মেয়েকে পরদিন মাসির বাড়ি নিয়ে যাবার ছল করে তাদের বনবাস দিয়ে এলেন। বনে ঘুরতে ঘুরতে তারা কতকগুলি মেয়েকে ইতুপূজা করতে দেখল। তাদের কাছ থেকে তারা জানল যে ইতুপূজা করলে বাপ-মায়ের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। এই কথা শুনে তারা বাড়ি গিয়ে ইতুপূজা করতে লাগল। ব্রাহ্মণ তাদের দেখে প্রথমে খুব চটে গেল, কিন্তু যখন ইতুপূজার মাহাত্ম্যের কথা শুনল, তখন কিছু নরম হল।

এর কিছুদিন পরে ওই দেশের রাজা মৃগয়ায় বেরিয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে তাদের বাড়ি এসে জল চাইল। উমনো-ঝুমনো জল এনে দিল। তাদের দেখে রাজা ও মন্ত্রী তাদের বিয়ে করতে চাইলেন।

বিয়ের পর স্বামিগৃহে যাবার দিন উমনো ভাত-তরকারি খেল। সেদিন ইতুপূজা, সেজন্য ঝুমনো শুধু ইতুর প্রসাদ খেল। উমনো রাজপ্রাসাদে আসা মাত্র নানারকম অঘটন ঘটতে লাগল। রাজা তাকে বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। ঝুমনো উমনোকে বলল—’বোন, তুই ইতুপূজার দিন ভাত খেয়েছিলি, সেজন্য ইতুর কোপে পড়েছিস্, তুই ইতুপূজা করে ইতুকে প্রসন্ন কর।’ উমনো তাই করল। রাজার আবার সমৃদ্ধি ফিরে এল। রাজা উমনোকে নিয়ে গেলেন। উমনো রাজাকে সব কথা বলল। সেই থেকে ইতুপূজার প্রচলন হল।

একদিন পার্বতী শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন— ‘তুমি কিসে সবচেয়ে বেশি তুষ্ট হও।’ শিব বললেন, ‘শিবরাত্রির দিন যদি কেউ উপবাস করে আমার মাথায় জল দেয় তো আমি খুব তুষ্ট হই।’ তখন মহাদেব পার্বতীকে একটা কাহিনী বললেন: বারাণসীতে এক ব্যাধ ছিল। একদিন সে অনেক পশু শিকার করে এবং তার ফিরতে রাত্রি হয়ে যায়।

বাঘ ভাল্লুকের ভয়ে সে এক গাছের উপর আশ্রয় নেয়। ওই গাছের তলাতেই এক শিবলিঙ্গ ছিল। রাত্রিতে ব্যাধ যখন ঘুমোচ্ছিল তখন তার এক ফোঁটা ঘাম (মতান্তরে নীহারকণা) মহাদেবের মাথায় পড়ে। সেদিন শিবরাত্রির দিন ছিল এবং ব্যাধ ও সারাদিন উপবাসী ছিল। মহাদেব তার ওই এক ফোঁটা ঘামেই তুষ্ট হন। যথাসময়ে যখন ব্যাধের মৃত্যু হয়, যমদূত এসে তাকে নরকে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু শিবদূত বাধা দিয়ে তাকে শিবলোকে নিয়ে গেল। এইভাবে শিবরাত্রি ব্রতের প্রচলন হল।

শীতলা পূজা প্রচলিত হয়েছিল এইভাবে : রাজা নহষ একবার পুত্রেটি যন্ত্র করে ছিলেন। যজ্ঞাগ্নি নির্বাপিত হয়ে শীতল হলে, তা থেকে এক পরমা সুন্দরী রমণী আবির্ভূতা হন। ব্রহ্মা তার নাম দেন শীতলা, এবং বলেন যে, ‘তুমি পৃথিবীতে গিয়ে বসন্তের কলাই ছড়াও, এরূপ করলে লোকে তোমার পূজা করবে।’ শীতলা বললেন,

‘আমি একা পৃথিবীতে গেলে, লোকে আমার পূজা করবে না, আপনি আমার একজন সঙ্গী দিন’।

ব্রহ্মা তাঁকে কৈলাসে শিবের কাছে যেতে বললেন। শীতলা কৈলাসে গিয়ে শিবের কাছে তাঁর প্রয়োজনের কথা বললেন। মহাদের চিন্তিত হয়ে ঘামতে লাগলেন। তাঁর ঘাম থেকে জরাস্থর নামে এক ভীষণকায় অসুর সৃষ্টি হল। জরাস্থর শীতলার সঙ্গী হলেন। শীতলা বললেন,

‘দেবতারা যদি আমার পূজা না করেন, তা হলে পৃথিবীর লোক করবে কেন?”

তখন শিব তাঁকে বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশে ইন্দ্রপুরীতে যেতে বললেন। ইন্দ্রপুরীর রাস্তা দিয়ে যাবার সময় জরাসুরের মাথা থেকে বসস্তের কলাইয়ের ধামাটা রাস্তায় পড়ে গেল। সে-সময় ইন্দ্রের ছেলে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। শীতলা তাকে ধামাটা জরাস্থরের মাথায় তুলে দিতে বললেন। ইন্দ্রের ছেলে এটা তার পক্ষে মর্যাদা হানিকর মনে করে, ব্রাহ্মণীকে ঠেলে ফেলে দিল।

শীতলা দেবী
শীতলা দেবী

শীতলার আদেশে জরায়ুর ইন্দ্রের ছেলেকে আক্রমণ করল। এর ফলে ইন্দ্রের ছেলে বসন্তরোগে আক্রান্ত হল। তারপর শীতলা দেবসভায় গিয়ে ইন্দ্রকে আশীর্বাদ করলেন। ইন্দ্ৰ তো চটে লাল। ভাবলেন সমস্ত জগতের লোক তাঁকে পূজা করে, আর এ কোথাকার এক বুড়ি এসে তাঁকে আশীর্বাদ করছে। এর আস্পর্ধা তো কম নয়! ইন্দ্র তাকে মেরে তাড়িয়ে দিলেন।

তারপর ইন্দ্র নিজেও বসন্তরোগে আক্রান্ত হলেন। অন্যান্য দেবতারাও হলেন। মহামায়ার দয়া হল। তিনি গিয়ে শিবের শরণাপন্ন হলেন। শিব বললেন, ‘দেবতারা সকলে শীতলার পূজা করুক, তা হলে রোগ মুক্ত হবে।’ তখন দেবতারা ঘটা করে শীতলার পূজা করলেন। এইভাবে শীতলা দেবলোকে স্বীকৃতি পেলেন।

তারপর শীতলা জরাস্থরকে নিয়ে পৃথিবীতে এলেন। প্রথমে তিনি বিরাট রাজার রাজ্যে এলেন। স্বপ্নে তিনি বিরাটকে শীতলার পূজা করতে বললেন। বিরাট বলল,

‘আমার বংশে কেউ কখনও নারীদেবতার পূজা করেনি, আমি নারীদেবতার পূজা করব না।’

বিরাটরাজ্যে মহামারীরূপে বসন্ত দেখা দিল। প্রজারা সব মরতে লাগল। বিরাটের তিন ছেলে মারা গেল। তবুও বিরাট অনড়, অটল। নারীদেবতার সে পূজা করবে না। বিরাটের এক পুত্রবধূ তখন পিত্রালয়ে ছিল।

শীতলা সেখানে গিয়ে তাকে বললেন, ‘তুমি যদি শীতলার পূজা কর, তা হলে তোমার স্বামী ও তার ভাইয়েরা বেঁচে উঠবে।’ পুত্রবধূ দ্রুত বিরাটরাজ্যে ফিরে এসে শীতলার পূজা করলেন। তার স্বামী ও তার ভাইয়েরা সব বেঁচে উঠল। শীতলা যে বসন্তের দেবতা তা বিরাটরাজার প্রত্যয় হল। সেই থেকে পৃথিবীতে শীতলা পূজার প্রচলন হল।

আট

অঞ্চলভেদে এসব কাহিনীর পার্থক্য আছে। তা ছাড়া, পরবর্তীকালে রচিত নূতন কাহিনী আদিম কাহিনীকে চাপা দিয়েছে। যেমন, ওপরে লক্ষ্মীর যে কাহিনী দেওয়া হয়েছে, সেটাই হচ্ছে আদি কাহিনী। এখন প্রতি বৃহস্পতিবার মেয়েরা লক্ষ্মীর পূজা করে, ছাপা বই দেখে পাঁচালী পাঠ করে, তার কাহিনী অন্যরূপ।

আবার অরণ্যষষ্ঠীর যে কাহিনী দেওয়া হয়েছে, তাছাড়া আর একটা কাহিনী আছে। সে কাহিনীতে ছোট বউয়ের কথা নেই। তার পরিবর্তে আছে অভিশপ্ত এক বিদ্যাধর বিদ্যাধরীর কাহিনী। সকল অলিখিত সাহিত্যের উপাথ্যানসমূহের রূপভেদ বিশেষভাবে লক্ষ্য করি গন্ধেশ্বরী পূজার কাহিনী সমুহে। গন্ধেশ্বরী হচ্ছে গন্ধবণিক জাতির দেবতা। গন্ধেশ্বরী তাদের শত্রু গন্ধাসুরকে বধ করেছিল বলেই গন্ধবণিক সমাজ তার পূজা করে। কিন্তু গন্ধেশ্বরী পূজার উদ্ভব সম্বন্ধে অন্য কাহিনীও প্রচলিত আছে।

অলিখিত এইসব উপাখ্যানের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, উপাখ্যানের মধ্যে অলৌকিক ঘটনার সন্নিবেশ। হিন্দু এসব কাহিনীর অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করত। সেই কারণেই হিন্দুর নৈতিক মান খুব উচ্চস্তরে ছিল। আজ হিন্দু সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মন থেকে পাপপুণ্যের বিশ্বাস ও লোপ পেয়েছে। সেজন্যই হিন্দুর নৈতিক মান আজ নিম্নস্তরে গিয়ে পৌঁছেছে।

আরও করুন:

“বাঙলার অলিখিত সাহিত্য | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!