সামাজিক সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

সামাজিক সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

সামাজিক সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান:

সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান হচ্ছে নৃবিজ্ঞান চর্চার যথাক্রমে ব্রিটিশ ও মার্কিন এতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত দুটি ঘনিষ্ঠ ধারা। নামকরণের পার্থক্য সত্ত্বেও শুরু থেকেই সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের মধ্যে সুস্পষ্ট কোন সীমারেখা ছিল না। (আপনারা যদি বাজারে প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের একাধিক পাঠ্যবই মিলিয়ে দেখেন, তাহলে লক্ষ্য করবেন যে, কোন পাঠ্য বইয়ের শিরোনামে হয়ত শুধু সামাজিক নৃবিজ্ঞান, এবং আরেকটাতে হয়ত শুধু সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান রয়েছে, কিন্তু সূচাপত্রে অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলোর তালিকা কমবেশী একইরকমই পাবেন।)

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, উভয় ধারার নৃবিজ্ঞানেরই সূচনা হয়েছিল সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপত্তি সম্পর্কে উনবিংশ শতান্দীতে প্রচলিত বিভিন্ন অনুমাননির্ভর তত্তের বিরোধিতা করে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উপাত্ত সংগ্রহের উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে।সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে যথাক্রমে ‘সমাজ’ ও “সংস্কৃতি প্রত্যয়ের উপর প্রাধান্য দেওয়া হলেও উভয় ধারার নৃবিজ্ঞানীরাই এই বিষয়গুলি অধ্যয়নের জন্য তথাকথিত আদিম জনগোষ্ঠীদের উপরই বেশী নজর দিয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, “আদিম” বলে বিবেচিত বিভিন্ন সমাজ ও তাদের সংস্কৃতির তুলনামূলক অধ্যয়নই একটা সময় পর্যন্ত সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের মূল পরিচায়ক ছিল। উভয় ধারার নৃবিজ্ঞানেই বিভিন্ন আদিম সমাজের জ্ঞাতিব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংগঠন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার, প্রভৃতি বিষয় নিয়ে গবেষণা হয়েছে।এসব কারণে, যেমনটা ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন, মার্কিন ধারার সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান ও ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞানকে একই বৃহত্তর ধারার অন্তর্পত হিসাবে গণ্য করা হয়, যাকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান হিসাবে অনেকেই অভিহিত করে থাকেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন ও এই ধারণার উপর গুরুতারোপের ক্ষেত্রে মার্কিন নৃবিজ্ঞানীরা অনেকটা ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী টায়লরের এঁতিহ্য অনুসরণ করেছেন, (টায়লরের দেওয়া সংস্কৃতির সংজ্ঞা আগেই উদ্ধৃত করা হয়েছে পাঠ ১-এ)।অন্যদিকে জ্ঞাতিসম্পর্কের মত বিষয় অধ্যয়নের উপর নজর দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা অনেকটা মার্কিন নৃবিজ্ঞানী মর্গানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটেনে যারা সামাজিক নৃবিজ্ঞানী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করেছিলেন, তারা মনে করতেন যে তাদের অধ্যয়নের মূল বিষয় ছিল “সমাজ’, বিশেষ করে “আদিম সমাজ’। উল্লেখ্য, সমাজ অধ্যয়নের জন্য সমাজবিজ্ঞান (sociology) নামে একটি জ্ঞানকান্ড ততদিনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সামাজিক জীব হিসাবে মানুষ মাত্রই যে কোন না কোন সমাজের সদস্য, এই সত্যটা উপলব্ধি করার জন্য আমাদের সমাজ বিজ্ঞান পড়ার দরকার পড়ে না।

আপনার আমার প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের জ্ঞান আছে, যা আমরা সমাজের সদস্য হিসাবে অর্জন করি। তবে সচরাচর আমরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতার বাইরে “সমাজ’ ধারণা নিয়ে বিমূর্তভাবে ভাবি না, বা পুরো সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে সংগঠিত, এটির বিভিন্ন অংশ কি কি এবং সেগুলি কীভাবে কাজ করে, কখন বা কেন সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে, এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে সচেতনভাবে ভাবি না। এ কাজটাই করার চেষ্টা করেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

জ্ঞানচর্চার একটি পৃথক শাখা হিসাবে সমাজবিজ্ঞানের অস্তিত সবসময় ছিল না। এটির জন্ম হয়েছিল ইউরোপে, যখন শিল্পায়নসহ বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইউরোপীয় সমাজসমূহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। পথিকৃৎ সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করতেন যে, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে যেভাবে অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে বিশ্ব-্রব্রহ্মান্ড ও জীবজগত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি সমাজকে বস্তুনিষ্ঠভাবে জানা সম্ভব।

সেজন্য চাই যথাযথভাবে নিরূপিত প্রত্যয়, তত্ব ও গবেষণা পদ্ধতির প্রয়োগ। এভাবে পরিবর্তনশীল ইউরোপীয় সমাজসমূহকে ভাল করে জানা ও বোঝার তাগিদ থেকে জন্ম হয়েছিল সমাজবিজ্ঞানের। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পথিকৃৎদের অন্যতম ছিলেন ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী ডূর্খাইম, যার চিন্তাভাবনা সরাসরি প্রভাবিত করেছিল ব্রিটিশ সামাজিক নৃবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা র্যাডক্লিফ-ব্রাউনকে। ফলে অনেক দিক থেকে ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞান গড়ে উঠেছিল সমাজবিজ্ঞানের আদলেই।

দু”য়ের মধ্যে মূল পার্থক্য যা ছিল তা হল, যেখানে সমাজবিজ্ঞানীদের নজর ছিল শিল্পায়িত সমাজগুলোর প্রতি, সেখানে সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণাক্ষেত্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন ইউরোপের উপনিবেশগুলোতে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত সরল বা আদিম বলে বিবেচিত সমাজগুলোকে। নৃবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এ ধরনের সমাজে ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞন গড়ে উঠেছিল সংগঠনের প্রধান ভিত্তি। ফলে সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সমাজের সমাজবিজ্ঞানের আদলেই।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

দুয়ের মধ্যে মূলের উপর বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। তারা দেখার চেষ্টা করেছেন, বংশধারা নানা বেখনেহ ব্যবস্থা প্রভৃতি কিভাবে উৎপাদন, বণ্টন, ক্ষমতা, মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে গবেষণাক্ষেত্র হিসাবে বেছে রোগের উপনিবেশগুলোতো ্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের সূচনাকালেও গবেষকদের দৃষ্টি ছিল প্রযুক্তি বা সামাজিক কৃত সরল বা আদিম বলে[রে অপেক্ষাকৃত “আদিম” বলে বিবেচিত সেদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের প্রতি। বিবেচ্তি সমাজওলোকে।

তারা “সংস্কৃতির ধারণাকে কেন্দ্র করে তাদের গবেষণা ও লেখালেখি সংগঠিত বলে বিবেচিত সেদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের প্রতি। পার্থক্য ছিল এই যে, তাঁরা সংস্কৃতির ধারণাকে কেন্দ্র করে তাঁদের গবেষণা ও লেখালেখি সংগঠিত করেছিলেন।

করোছলেনা বলা বাহুল্য, প্রচলিত অর্থে সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, তার থেকে ভিন্ন বা ব্যাপকতর অর্থে নৃবিজ্ঞানীরা শব্দটিকে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, প্রচলিত ব্যবহারে সংস্কৃতি শব্দটি নৃত্য-গীত জাতীয় বিষয়কেই নির্দেশ করে। আমরা যখন কোন “সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’-এর কথা বলি, অথবা যখন কোন ব্যক্তি বা পরিবারকে “সংস্কৃতিমনা” হিসাবে চিহ্নিত করি, তখন শব্দটিকে এ ধরনের একটি বিশেষ অর্থেই ব্যবহার করি।

ইংরেজীসহ ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায়ও সংস্কৃতির সমার্থক শন্দসমূহ শুরুতে মূলতঃ এরকম প্রচলিত অর্থেই ব্যবহৃত হত, ফলে সমাজের বিভিন্ন অংশকে তথা বিভিন্নসমাজকে সাংস্কৃতিক মানদন্ডে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হিসাবে দেখার প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে ও্পনিবেশিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ইউরোপীয় বংশোভভূত শ্বেতাঙ্গ মানুষদের চোখে উপনিবেশসমূহের আদিম অধিবাসীদের সংস্কৃতি ছিল খুবই নিয়মানের।

সাধারণভাবে প্রত্যেক মানুষের কাছে তার নিজের সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতি আচার-প্রথা ইত্যাদি-_অর্থাৎ এক কথায় তার নিজের সংস্কৃতি-স্বাভাবিক বলে মনে হয়, এবং ভিন্ন কোন সংস্কৃতির মুখোমুখি হলে সেটার অনেক কিছুকে অস্বাভাবিক বা অদ্ভূত বলে মনে হতে পারে। এই প্রবণতাকে নৃবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন স্বজাতিকেন্দ্রিকতা (ethnocentrism)। মানুষ হিসাবে একজন নৃবিজ্ঞানীর মধ্যেও স্বজাতিকেন্দ্রি প্রবণতা থাকতে পারে, যা ভিন্ন একটি সংস্কৃতিকে জানতে বুঝতে গেলে অন্তরায় হয়ে দীড়াতে পারে, বিশেষ করে তা যদি হয়

আদিম বলে বিবেচিত কোন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। এই প্রেক্ষিতে আধুনিক মার্কিন নৃবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঞ্জ বোয়াস ও তার অনুসারীরা “সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ” (cultural relativism) নামে পরিচিত হয়ে ওঠা একটি দৃষ্টিভঙ্গীর উপর জোর দিয়েছিলেন, যেটার মোদ্দা কথা হল কোন ভিন্ন সংস্কৃতিকে অধ্যয়ন করতে হলে এঁ সংস্কৃতির ধারক বাহকদের দৃষ্টিকোণ থেকেই সেটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানার এবং ভাল করে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও মার্কিন ধারার সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে “সমাজ ও “সংস্কৃতি” ধারণার আপেক্ষিক গুরুত নিরূপণের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য থেকে থাকতে পারে, কিন্তু কোন ধারাতেই একটি ধারণাকে বাদ দিয়ে শুধু অন্যটির উপর জোর দেওয়া হয় নি। (মানুষ সংস্কৃতি শেখে সমাজের সদস্য হিসাবে, কাজেই সমাজের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সংস্কৃতির কথা বলা অর্থহীন। আবার সংস্কৃতির ধারণা বাদ দিলে মানব সমাজের বৈশিষ্ট্য বোঝা সম্ভব না, কারণ মানুষ ছাড়াও সমাজবদ্ধ প্রাণী আরো রয়েছে, কিন্তু একমাত্র মানবসমাজের ক্ষেত্রেই সংস্কৃতির ধারণা প্রযোজ্য।)

উভয় ধারাতেই মূলতঃ আদিম বলে বিবেচিত জনগোষ্ঠীদের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালন্ধ তথ্য সংগ্রহের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। একদিকে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের চাপের মুখে আদিবাসী আমেরিকানরা বিলুপ্ত বা আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার আগেই সেসব জনগোষ্ঠী ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে যতটা সম্ভব বিস্তারিত ও নিখুঁত দলিল তৈরী করার ব্যাপারে মার্কিন নৃবিজ্ঞানীরা বিশেষ তাগিদ বোধ করেছিলেন।

একইভাবে ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের নৃবিজ্ঞানীরাও মনোযোগী ছিলেন ও্পনিবেশিক সাম্রাজ্যসমূহের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত “আদিম” জনগোষ্ঠীদের সম্পর্কে বিশদ বিবরণ সংগ্রহ করার ব্যাপারে। এভাবে আটলান্টিকের উভয় পারের নৃবিজ্ঞান চর্চার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথাকথিত আদিম জনগোষ্ঠীদের সার্বিক জীবন যাত্রার ধরন, তাদের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক সংগঠন, ধমীয়ি বিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করার একটা এতিহ্য তৈরী হয়।

এভাবে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিন্তিতে বিভিন্ন সমাজ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে আলাদা আলাদা বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে সামষ্টিকভাবে, বা এ প্রক্রিয়ায়  রচিত কোন গ্রন্থকে, নৃবিজ্ঞান  এথনোগ্রাফি বলা হয় (enthnography: এই শব্দের প্রথম উপাদান, ethno-, গ্রীক ভাষা থেকে উদ্ভূত, যার বাংলা অর্থ করা যেতে পারে ‘জাতি’ বা ‘জনগোষ্ঠী”; -graphy বলতে বোঝায় লিখার প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি)। এখনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের কর্মকান্ডের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে এথনোগ্রাফি রচনা করা, যদিও সমকালীন এথনোগ্রাফিগুলো আগের মত শুধুই তথাকথিত আদিম সমাজগুলোকে ঘিরে তৈরী করা হয় না।

নৃবৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডের একটি গুরত্তপূর্ণ ক্ষেত্র হিসাবে এথনোগ্রাফি-চর্চার প্রসারের পেছনে একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন সমাজের তুলনামূলক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যের একটি ভান্ডার গড়ে তোলা। উনবিংশ শতাব্দীতেই এথনোলজি (ethonology) বা জাতিতত্ত্ব  নামে পরিচিত নৃবিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত শাখা গড়ে উঠেছিল এ ধরনের তুলনামূলক অধ্যয়নকে ঘিরেই।

তবে তখন যে ধরনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে জাতিততুবিদরা তুলনামূলক বিশ্লেষণের কাজ করতেন – বণিক, উপনিবেশিক প্রশাসক, পরিব্রাজক, মিশনারী প্রভৃতি শ্রেণীর লোকদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য – সেগুলির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল। এই প্রেক্ষিতে নূতন প্রজন্মের প্রশিক্ষিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীদের রচিত এথনোগ্রাফিগুলি জাতিতাত্তিক অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তথ্যের অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য উৎস হিসাবে বিবেচিত হতে থাকে।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

সেই সূত্রে এথনোগ্রাফি ও এথনোলজিকে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের দুইটি পরস্পরসম্পর্কিত ক্ষেত্র বা শাখা হিসাবে অনেকে চিহিতিত করেছেন, আবার অনেকে এথনোলজি কথাটা কমবেশী সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের সমার্থক হিসাবেই ব্যবহার করেছেন। তবে সময়ের সাথে সাথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের সমার্থক হিসাবে বা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসাবে এথনোলজি নামের ব্যবহার প্রায় অপ্রচলিত হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে বিষয়-ভিত্তিক বিশেষায়নের মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে অর্থনৈতিক নৃবিজ্ঞান, রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞান, ধর্মের নৃবিজ্ঞান ইত্যাদি আলাদা আলাদা ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।

বিংশ শতাদ্বীর দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালে ইউরোপীয় ওপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো গুটিয়ে নেওয়া হয়েছিল আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাগ্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রসারের মুখে। এই প্রেক্ষিতে স্বাধীনতাকামী বা সদ্যস্বাধীন দেশগুলোতে নৃবিজ্ঞানীদের উপস্থিতি প্রশ্নের মুখে পড়তে শুরু করে । এমন অভিযোগ উঠতে থাকে যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের জ্ঞান আসলে উঁপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষেই কাজ করে।

অন্যদিকে, খোদ পশ্চিমা দেশগুলোতেও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন দেখা দিয়েছিল, যেমন ষাট ও সত্তরের দশকে সংখ্যালঘু, নারী ও তরুণদের অধিকারের প্রশ্নে অনেকে সোচ্চার হতে শুরু করে। এই ধরনের পরিছিতিতে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানীদের মত নৃবিজ্ঞানীরাও অনেকে নিজেদের জ্ঞানচর্চার এরতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তলিয়ে দেখতে শুরু করেন।

এই আত্মসমীক্ষার প্রক্রিয়ায় সব নৃবিজ্ঞানী সমানভাবে শামিল না হলেও ক্রমশঃ এই উপলব্ধি ব্যাপকতা পেতে শুরু করে যে, “আদিম সমাজ’- কেন্দ্রিক  নৃবিজ্ঞান চর্চার দিন ফুরিয়ে গেছে। ফলে পূর্বের এতিহ্য থেকে সরে এসে অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীই গবেষণার নূতন ক্ষেত্র, নূতন বিষয়, নৃতন পদ্ধতি ও নৃতন তাত্তিক কাঠামোর অনুসন্ধান করেছেন। এই অনুসন্ধানের ফলাফল স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা যাবে না, তবে সংক্ষেপে কিছু প্রবণতার কথা উল্লেখ করা যায়।

সমকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা কাজ করেন সম্ভাব্য সব ধরনের গবেষণাক্ষেত্রে – সেটা হতে পারে কৃষক অধ্যুষিত কোন গ্রাম, শহরের মধ্যবিত্ত-অধ্যুষিত কোন এলাকা, কোন বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা শিল্পাঞ্চল। এগুলো হল বাহ্যিক পরিসরে নৃবিজ্ঞানীদের বিচরণের নৃতন ক্ষেত্র। গবেষণার বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বা তাত্বিক ও পদ্ধতিগতভাবেও সমকালীন নৃবিজ্ঞানীদের বিচরণের পরিধি অনেক বেশী উন্মুক্ত। পরিবারে লিঙ্গীয় অসমতা থেকে শুরু করে বিশ্বায়ন, সব ধরনের বিষয় নিয়ে তারা গবেষণা করেন।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

তাত্তিক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে কেউ নিজেকে চিহ্নিত করতে পারেন নারীবাদী হিসাবে, পরিবেশবাদী হিসাবে, বা উত্তর-আধুনিকতাবাদী হিসাবে। নৃবিজ্ঞানী পরিচয়ধারী এমন গবেষককেও আপনি খুঁজে পাবেন যিনি “মাঠে? নয়, পরতিহাসিক দলিলপত্রের সংগ্রহশালাতেই সময় কাটাচ্ছেন। মোট কথা, সমকালীন প্রেক্ষিতে একজন সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী কোন্‌ কোন্‌ দিক থেকে একজন অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদের থেকে আলাদা, তা সবক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া যাবে না।

সারাংশ

সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক হবিজ্ঞান হচ্ছে নৃবিজ্ঞান চচার্র যথাক্রমে বিটিশ ও মাকিন এতিহোর সাথে সম্পকিতি দুটি ঘনিষ্ঠ ধারা।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, উভয় ধারার নৃবিজ্ঞানেরই সূচনা হয়েছিল সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান বা সামাজিক এতিষ্ঠানসমূহের উৎপত্তি সম্পকে উনবিংশ শতাব্দীতে এচলিত বিভিন্ন অনুমাননিভর তত্ত্বের বিরোধিতা করে প্রত্যক্ষ পরর্বেক্ষণের মাধ্যমে উপাত সংগ্রহের উপর জোর দেওয়ার মাধামে। সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে যথাক্রমে ‘সমাজ’ ও ‘সংস্কৃতি’ প্রত্যয়ের উপর প্রাধান দেওয়া হলেও উভয় ধারার নৃবিজ্ঞােনীরাই এই বিষয়গুলি অধ্যয়নের জন্য তথাকথিত আদিম জনগো্ঠীদের উপরই বেশী নজর দিয়েছিলেন।

মাকিনি ধারার সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান ও ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞানকে একই বৃহত্তর ধারার আন্তর্গত  হিসাবে গণ্য কর৷ হয়, যাকে সামাজিক-সাংক্কৃতিক নৃবিজ্ঞান হিসাবে অনেকেই অভিহিত করে থাকেন।

 সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান
সামাজিক/সাংসকৃতিক নৃবিজ্ঞান

মাকিন যুক্রাে সাংস্কৃতিক হৃবিজ্ঞানের সূচনাকালেও গবেষকদের দৃষ্টি ছিল এয়ুক্তি বা সামাজিক সংগঠনের ধরন অনুসারে অপে্গকৃত ‘আদিম’ বলে বিবেচিত সেদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের এরতি।ব্রিটিশ ধারার সামাজিক নৃবিজ্ঞান ও মাকিন ধারার সাংস্কৃততিস নৃবিজ্ঞানে ‘সমাজ’ ও “সংস্কৃতি ধারণার আপেক্ষিক গুরণ্ত নিরূপণের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য থেকে থাকতে  পারে, কিত কোন ধারাতেই একটি ধারণাকে বাদ দিয়ে শুধু অন্যটির উপর জোর দেওয়। হয় নি। উভয় ধারাতেই মূলতঃ আদিম বলে বিবেচিত জনগোষ্ঠীদের সম্পকে ধ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব তথ্য সংগরহের উপর জোর দেওয়। হয়েছে।

সমকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক হৃবিজ্ঞানীর৷ কাজ করেন সম্ভাব্য সব ধরনের গবেষণাক্ষেত্রে – সেটা হতে পারে কৃষক অধ্যুষিত কোন এম, শহরের মধ্যবিত-অধ্যষিত কোন এলাকা, কোন বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা শিল্পাঞ্চল। গবেষণার বিষয় নিধার্রণের ক্ষেত্রে বা তাতিক ও পদ্ধাতিগতভাবেও সমকালীন নৃবিজ্ঞানীদের বিচরণের পরিধি অনেক বেশী উন্মুক।

আরও দেখুনঃ

 

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!