নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব: আগের আলোচনাতে আপনারা দেখেছেন যে, ভাষা হচ্ছে মানব প্রজাতির একটি অনন্য সম্পদ। নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা একটি প্রজাতি হিসাবে মানুষের স্বরূপ বা বিবর্তনের ইতিহাস জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য ভাষার বিশেষত সম্পর্কে ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গী ও গবেষণা খুবই প্রাসঙ্গিক।

 

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

পৃথিবীর ইতিহাসে ঠিক কবে মানুষের আবির্ভাব ঘটল, অনেক নৃবিজ্ঞানীর কাছে এ প্রশ্নের একটা ভিন্ন রূপ হচ্ছে, মানব বিবর্তনের ঠিক কোন পর্যায়ে ভাষার আবির্ভাব ঘটল? হাজার হাজার বা লক্ষাধিক বছর আগে মানুষের পূর্বপুরুষরা ঠিক কি ধরনের ভাষা ব্যবহার করত, তা সরাসরি জানার কোন উপায় নেই, কিন্তু মানুষের কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য – যেমন তার মগজের আয়তন, ধনি উৎপাদনে সক্ষম বিশেষ কিছু প্রত্যঙ্গ – যেগুলো তাকে ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে, সেগুলোর বিবর্তন সম্পর্কে দৈহিক নৃবিজ্ঞানীরা আলোকপাত করতে পারেন।

নৃবিজ্ঞানের আওতায় ভাষাতত্ত্ব চর্চার ধারাকে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান বা নৃবৈজ্ঞানিক ভাষাতত্ বলা হয় (অর্থের কোন সুস্পষ্ট পার্থক্য ছাড়াই উভয় নামকরণই নৃবিজ্ঞানে চালু রয়েছে)। বোয়াসের নেতৃতে প্রতিষ্ঠিত
মার্কিন ধারার নৃবিজ্ঞানের একটি প্রধান শাখা হিসাবে ভাষাতাত্তিক নৃবিজ্ঞানকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল।

এর একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী আমেরিকানদের ভাষাসমূহ অধ্যয়ন করা। আর সাধারণ ভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা সবাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন সব জনগোষ্ঠীদের মধ্যে মাঠকর্ম করতেন যাদের ভাষাসমূহের কোন লিখিত রূপ ছিল না, এবং যেগুলো বিভিন্ন দিক থেকে নৃবিজ্ঞানীদের জানা ভাষা থেকে খুবই পৃথক। কাজেই মাঠকর্মের শুরুতেই অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানীর প্রথম কাজ হয়ে দীড়াত অন্ততঃ কাজ চালানোর মত করে স্থানীয় ভাষা রপ্ত করা।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

এভাবে দেখা গেছে, গবেষণার বিষয়ের সাথে ভাষার কোন সরাসরি সম্পর্ক হয়ত নেই, কিন্তু একজন নৃবিজ্ঞানী তার গবেষণা এলাকার জনগোষ্ঠীর ভাষা ভালভাবে রপ্ত করেছেন, বা সে ভাষার ধুনিতত্, কাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করে ফেলেছেন। এসব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানও অনেক ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান চর্চার গুরুত্ব পূর্ণ অংশ হয়েছে।

ভাষাতত্ত্বিক  নৃবিজ্ঞানীদের অনেকের সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে ধতিহাসিকর ভাষাতত্ত্ব  চর্চার সাথে। তিহাসিক ভাষাতত্বে পরস্পর-সদৃশ একাধিক ভাষার তুলনামূলক অধ্যয়নের মাধ্যমে ওই ভাষাগুলোর এঁতিহাসিক
সম্পর্ক নিরূপণের চেষ্টা করা হয়।

আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, বাংলা, অহমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দী প্রভৃতি ভাষার মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে।ফলে প্রশ্ন করা সম্ভব, এই ভাষাগুলোর কাঠামো, শন্দভান্ডার কি একই উৎস থেকেই এসেছে? এসে থাকলে আদি-ভাষার বা ভাষাসমূহের কাঠামো বা শব্দভান্ডার কেমন ছিল? এ জাতীয় প্রশ্ন করার মাধ্যমে বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানীরা একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে চেষ্টা করেন। এ ধরনের গবেষণার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীদের ধতিহাসিক সম্পর্ক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য বা তত্ত্ব পাওয়া গেছে।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

এ প্রসঙ্গে এখানে অবশ্য এ কথা যোগ করা দরকার যে, ভাষা, সংস্কৃতি ও নরবর্ণণত উৎপত্তির (racial origin) বিষয়গুলোকে একাকার করে দেখা ঠিক না। দুটো জনগোষ্ঠীর ভাষা বা সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ মিল থাকার অর্থ এই না যে তারা জাতিগতভাবেও একই উৎস থেকে এসেছে। অন্যদিকে মূলতঃ একই উৎস থেকে উদ্ভূত দুটো জনগোষ্ঠী ভাষাগতভাবে বা সাংস্কৃতিকভাবে অনেক দূরে সরে যেতে পারে। এসব ধারণা স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে মার্কিন নৃবিজ্ঞানী বোয়াস গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বোয়াস ভাষা ও সংস্কৃতির ধারণাকেও পৃথক রাখতে চেয়েছিলেন, যার অর্থ হল দুটো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষাগত মিল থাকলেও অন্যান্য দিক দিয়ে সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকতে পারে, আবার ভাষাগত পার্থক্য সত্তেও অনেকক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মিল থাকতে পারে।

অনেক নৃবিজ্ঞানী অবশ্য ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ককে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। বোয়াসের একজন ছাত্র এডওয়ার্ড সাপির তার সহযোগী বেনজামিন হুয়ার্ষের সাথে মিলে একটা তাত্তিক সম্ভাবনার রূপরেখা দিয়েছিলেন (যা Sapir-Whorf hypothesis নামে পরিচিত), যেটি অনুসারে একেকটা ভাষা নির্ধারণ করে দেয় সেই ভাষাভাষীরা চারপাশের সামাজিক ও প্রাকৃতিক জগতকে কিভাবে দেখে।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

ধারণাটা অনেকটা এরকম, বাংলা ভাষায় ‘দেখতে সুন্দর/কালো’ জাতীয় কথা ব্যবহৃত হয় বলে একজন বাংলাভাষী শিশু গায়ের রংকে সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করে।

এসব ক্ষেত্রে অবশ্য কার্-কারণ সম্পর্কটা উল্টোভাবেও বিবেচনা করা যায়। যাই হোক, ভাষার সরাসরি কোন নির্ধারক ভূমিকা থাক বা না থাক, তাকে দেখা যায় সমাজের মূল্যবোধ, মতাদর্শ ইত্যাদির দর্পণ হিসাবে।

সাপিরদের তত্ত্বে আসলে  সামাজিক পরিমন্ডলের চাইতে স্থান-কাল ইত্যাদি সংক্রান্ত বিমূর্ত ধারণার উপরই বেশী জোর দেওয়া হয়েছিল। এদিক থেকে সামাজিক ভাষাতত্তে (sociolinguistics) ভাষা ও সমাজের সম্পর্ক অনেক বেশী সরাসরি অধ্যয়ন করা হয়। যেমন, বাংলায় আমরা কাউকে সম্বোধন করি “তুমি করে, কাউকে “আপনি”, আবার কাউকে ‘তুই’। আবার এদেশে এটাও প্রায়ই দেখা যায়, একই ব্যক্তি স্থান-কাল- পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ভাষা ব্যবহার করে–শুদ্ধ বাংলা, আঞ্চলিক/কথ্য ভাষা, ইংরেজী মেশানো বাংলা, ইত্যাদি।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

এসব বিষয় তলিয়ে দেখার মাধ্যমে আমরা এদেশের সামাজিক সম্পর্ক বা সমাজ কাঠামো সম্পর্কে কি বলতে পারি? এধরনের প্রশ্নের উত্তর নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যেও অনেকে খোজার চেষ্টা করেছে তাদের গবেষণার মাধ্যমে।স্পষ্টতই, ভাষার নৃবৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের বিবিধ এতিহ্য বা ধারা রয়েছে। একক ভাবে কোনটিকে হয়ত ভাষাতাত্তিক নৃবিজ্ঞানের মূল প্রবণতা হিসাবে শনাক্ত করা যাবে না, কিন্তু একথা নিশ্চয় বলা যায় যে,
সম্মিলিতভাবে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের আন্তঃসম্পর্ককে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে চলছে।

সারাংশ-প্রত্নতত্ত্ব

সারাংশঃ

প্রত্নতত্ত্ব হচ্ছে সেই বিজ্ঞান, যা অতীতকালের মানুষদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন বস্তুু-সামগ্রীর ধংসাবশেষ সুনিপৃণ খননকাধের মাধ্যমে পুনরন্ফার করে সেগুলোর ভিভিতে তাদের সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি প্রভৃতির  রূপরেখা পুননিমার্ণ করে।

বিশ্বের অনেক দেশেই প্রত্নতত্ত্ব একটি স্বতন্ত্র  জ্ঞানকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক জায়গায় আবার নৃবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসাবেও এর চর্চা রয়েছে, বিশেষ করে মাকিন
যুক্তরাষ্ট্রে। নৃবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসাবে যখন এর  চর্চা হয়    , তখন তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক  নৃবিজ্ঞান  বা  নৃবৈজ্ঞানিক  প্রত্নতত্ত্ব বলা হয়।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

প্রত্নতত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানকে  প্রাগৈতিহাসিক  প্রত্নতত্ত্ব (prehistoric archaeology) বলা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক  বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য একজন নৃবিজ্ঞানীকে একাধারে  ভূত্তত্ব, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা অজর্ন করতে হয়। ভূগভের্র বিশেষ কোন স্তর থেকে খননকার্যের  ফলে আবিষ্কৃত কোন এাচীন মানব বসতির ধংসাবশেষ থেকে সযত্নে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন নমুনা

বিশ্লেষণ  করার মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীর। জানার চেষ্টা করেন উক্ত বসতি কবেকার, সেখানকার মানুষের কি ধরনের  উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ খাবার খেত, কি ধরনের হাতিয়ার ও তৈজসপত্র ব্যবহার করত, ইত্যাদি।

প্রত্নতত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ! পরায় সময়ই দৈহিক নৃবিজ্ঞানীদের  সাথেও একযোগে কাজ করেন। প্রত্নতত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের  গবেষণার ফলে আমরা  একদিকে যেমন প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিবতর্নের গতিপ্রকৃতি সম্পকে সাধারণ কিছু ধারণা লাভ করি, তেমনি নির্দিষ্ট  কোন দেশ বা অঞ্চলের প্রাক – ও এাচীন ইতিহাস সম্পকে জানার  সুযোগ নাই। ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যয়নের বিষয়বস্তু হল ভাষা।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

ভাষা মানব সমাজে তথ্য ও ভাব বিনিময়ের এধান মাধাম। ভাষার মাধামে দূরের-কাছের,অতীতের -ভবিষ্যতের,  ইন্দ্রিয়াগ্রাহ্য -ইন্দ্রিয়াতীত , সম্ভব-অসম্ভব অসংখ্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করার, তথ্য বিনিময়ের যে ক্ষমতা মানুষ অজর্ন করেছে, এ ধরনের ক্ষমতা প্রাণীজগতে অন্য কোন প্রজাতির ক্ষেত্রে দেখা যায় না।নৃবিজ্ঞানের আওতায় ভাষাতত্ত্ব চচার্র ধারাকে ভাষাতাত্ত্বিক  নৃবিজ্ঞান বা নৃবৈজ্ঞানিক  ভাষাতত্ত্ব বলা হয়।

ঝোয়াসের নেতৃতে এতিষ্ঠিত মাকিন ধারার নৃবিজ্ঞানের একটি প্রধান শাখ৷ হিসাবে ভাষাতাত্ত্বিক  নৃবিজ্ঞানকে অন্তভূক্তি করা হয়েছিল। বোয়াস ভাষা ও সংস্কৃতির ধারণাকেও পৃথক রাখতে চেয়েছিলেন, যার অর্থ হল দুটো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষাগত মিল থাকলেও অন্যান্য দিক দিয়ে সাংস্কাতিক পার্থক্য থাকতে পারে, আবার ভাষাগত পার্থক্য সত্তেও অনেকক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মিল থাকতে পারে।

নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব
নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব

ভাষার নৃবৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের বিবিধ ঐতিহ্য বা ধারা রয়েছে। একক ভাবে কোনটিকে হয়ত ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানের মূল প্রবণতা হিসাবে শনাক্ত করা যাবে না, কিন্তু একথা নিশ্চয় বলা যায় যে, সম্মিলিতভাবে
ভাষাতাত্তিক নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের আন্তঃসম্পকর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ খেকে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে চলছে।

আরও দেখুনঃ

 

“নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ব”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন